বাসন ধোয়ার স্পঞ্জ কিংবা ধাতব মাজুনি ব্যবহার করলে ক্যানসার হতে পারে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন আশঙ্কার কথা বলা হলেও বিজ্ঞানের তথ্যে এর ভিত্তি মেলেনি। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত স্পঞ্জে বিপুল পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে এবং কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বের হতে পারে। তবে এসব কারণ থেকে মানুষের শরীরে ক্যানসার সৃষ্টি হয়, এমন কোনো সরাসরি প্রমাণ গবেষকেরা পাননি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় গ্রেটার নয়ডার একটি হাসপাতালের সার্জিক্যাল অনকোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অভিজিৎ কোটাবাগি জানান, স্পঞ্জের আর্দ্র ও ছিদ্রযুক্ত গঠনের কারণে সেখানে সহজেই জীবাণু জমে। তবে সাধারণ রান্নাঘরের স্পঞ্জ থেকে ক্যানসার হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এখানে মূল ঝুঁকি ক্যানসার নয়, বরং অপরিচ্ছন্ন স্পঞ্জের কারণে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
২০২২ সালে ‘জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড মাইক্রোবায়োলজি’তে প্রকাশিত নরওয়ে ও পর্তুগালের গবেষকদের এক গবেষণায় ব্যবহৃত স্পঞ্জ ও ব্রাশ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে অ্যাসিনেটোব্যাকটার ও সিউডোমোনাসসহ নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখা যায়। তবে গবেষকেরা জানান, স্পঞ্জে থাকা সব ব্যাকটেরিয়াই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। পাশাপাশি স্পঞ্জের তুলনায় বাসন ধোয়ার ব্রাশ দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানে সালমোনেলার মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার অপেক্ষাকৃত কম হয়।
এদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট এক গবেষণায় দেখা যায়, কিছু সিনথেটিক স্পঞ্জ ঘর্ষণের কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ায়। তবে এসব কণা বাসনের মাধ্যমে মানবদেহে ঠিক কতটা প্রবেশ করছে বা এর থেকে ক্যানসার সৃষ্টি হতে পারে কি না, তার কোনো প্রমাণ সেখানে মেলেনি। একইভাবে ২০২৫ সালে ইউরোপীয় খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনাতেও মানুষের প্রকৃত সংস্পর্শের মাত্রা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
ধাতব মাজুনির ক্ষেত্রেও ক্যানসারের সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য ঝুঁকি মেলেনি। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারে স্টিলের সরু তার ক্ষয়ে ভেঙে বাসনে লেগে থাকতে পারে। অসাবধানতাবশত তা খাবারের সঙ্গে শরীরে গেলে শারীরিক আঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মতে, স্পঞ্জের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হলো খাদ্যবাহিত সংক্রমণ। কাঁচা মাছ-মাংসের রস বা খাবারের উচ্ছিষ্ট মোছার পর একই স্পঞ্জ দিয়ে বাসন ধুলে ক্ষতিকর জীবাণু চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (USDA) খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিদর্শন বিভাগ জানিয়েছে, রান্নাঘরের স্পঞ্জ জীবাণুর প্রধান উৎসগুলোর একটি হতে পারে এবং তা সম্পূর্ণ পরিষ্কার রাখা বেশ কঠিন। ২০২৬ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি’তে প্রকাশিত ৯৮টি ব্যবহৃত স্পঞ্জের এক গবেষণায় দেখা গেছে, খালি চোখে পরিষ্কার মনে হলেও স্পঞ্জের ভেতরে বিপুল পরিমাণ জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাসন ধোয়ার উপকরণ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের ভীতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্পষ্ট করা জরুরি। ক্যানসারের আশঙ্কার চেয়ে রান্নাঘরের স্পঞ্জের মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণুঘটিত খাদ্যদূষণই বাস্তব স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা সাধারণ পরিচ্ছন্নতা সচেতনতার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আপনার কী করা উচিত?
- 1বাসন ধোয়ার পর স্পঞ্জ ও মাজুনি ভালোভাবে ধুয়ে খাবারের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করে ফেলুন।
- 2ভেজা স্পঞ্জ সিঙ্কে ফেলে না রেখে ভালো বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে শুকিয়ে নিন, অথবা দ্রুত শুকায় এমন ডিসওয়াশিং ব্রাশ ব্যবহার করুন।
- 3কাঁচা মাছ-মাংসের রস বা উচ্ছিষ্ট পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত স্পঞ্জ দিয়ে সাধারণ থালাবাসন ধোয়া থেকে বিরত থাকুন।
- 4স্পঞ্জে দুর্গন্ধ হলে, ক্ষয় দেখা দিলে বা ময়লা জমলে তা পরিবর্তন করুন; একইভাবে ধাতব মাজুনির তার আলগা হয়ে গেলে তা ফেলে দিন এবং বাসনে কোনো তার লেগে আছে কি না লক্ষ্য রাখুন।
সূত্র: Daily Amader Shomoy










