বাংলাদেশে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জমি, ফ্ল্যাট বা অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পরিচিত পদ্ধতি হলো দান বা হেবা। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে কর প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যাখ্যা এবং অর্থ আইনের মাধ্যমে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়মে বিষয়টির বিস্তারিত রূপরেখা পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে, দলিলে কেবল ‘হেবা’ বা ‘দান’ লেখা থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয় না; বরং লেনদেনের প্রকৃত ধরন, দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক এবং আইনের আওতা অনুযায়ী করদায় নির্ধারিত হয়।

দানকর আইন, ১৯৯০ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও বিনা প্রতিদানে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করলে তা দান হিসেবে গণ্য হতে পারে। দানকর মূলত দাতার আর্থিক দায়। তবে সব দানে দানকর দিতে হয় না। আইন অনুযায়ী পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান এবং আপন ভাই-বোনকে করা দান সম্পূর্ণ দানকরমুক্ত। এ ছাড়া বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি, সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা নির্দিষ্ট শর্তে ধর্মীয়, দাতব্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দান করলেও অব্যাহতি পাওয়া যায়। কিন্তু দাদা-নাতি, নানা-নাতনি, চাচা-ভাতিজা বা বন্ধুদের মধ্যে দান শুধু সম্পর্কের কারণে করমুক্ত নয়। এসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো অর্থবছরে সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দানকরমুক্ত সুবিধা পাওয়া যায়।

অ-নগদ সম্পত্তি যেমন জমি বা ফ্ল্যাট দানের ক্ষেত্রে করযোগ্য মূল্য নির্ধারিত হয় দানের তারিখে ওই সম্পত্তির খোলাবাজার মূল্যের ভিত্তিতে। দলিলে কম মূল্য উল্লেখ থাকলেও কর নির্ধারণে বাজারমূল্য বিবেচ্য হতে পারে। করযোগ্য দানের ক্ষেত্রে ধাপভিত্তিক করহার প্রযোজ্য—প্রথম ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে দানকর হিসাব করতে হয়। কোনো অর্থবছরে করযোগ্য দান করা হলে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারের কাছে দানের রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম রয়েছে।

দানকরের পাশাপাশি দানগ্রহীতার আয়করের বিষয়টিও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়। আয়কর আইন অনুযায়ী দান সাধারণত গ্রহীতার ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে গণ্য হয়। তবে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও আপন ভাই-বোনের কাছ থেকে পাওয়া দান গ্রহীতার জন্য আয়করমুক্ত থাকে, যদি তা উভয়ের আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত হয়। অবশ্য বিদেশে অবস্থানরত কোনো দাতা ব্যাংকিং চ্যানেলে দান পাঠালে তাঁর নিজস্ব রিটার্নে প্রদর্শনের শর্তটি প্রযোজ্য হয় না।

অন্যদিকে সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইনের ধারা ১২৫-এ নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় কোনো সম্পত্তি হেবা বা দানের মাধ্যমে হস্তান্তরের সময় যদি দানকর আইন প্রযোজ্য হয়, তবে নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা এ-চালানের মাধ্যমে সরাসরি নির্ধারিত দানকর সংগ্রহ করবেন। সে ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের মতো আলাদা করে উৎসে কর আদায়ের প্রয়োজন হবে না। এনবিআরের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, এই বিধান কেবল হেবা বা দানের ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

সম্পত্তি হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে সাধারণ ক্রয়-বিক্রয় ও হেবার করব্যবস্থায় যে পার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়ায় নিবন্ধন পর্যায়ে অতিরিক্ত করের জটিলতা কমেছে। একই সঙ্গে পারিবারিক নির্দিষ্ট সম্পর্কের বাইরে সম্পত্তি হস্তান্তর করলে বাজারমূল্যের ওপর নির্ধারিত ধাপভিত্তিক দানকর এবং রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রেক্ষাপট

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে থাকা স্বজনদের কাছে সম্পদ বা অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য। বিদেশে থাকা কোনো ব্যক্তি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী কিংবা ভাই-বোনকে দান পাঠালে গ্রহীতার হাতে তা আয়করমুক্ত থাকবে এবং এ ক্ষেত্রে প্রবাসীকে দেশে রিটার্নে তা প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

আপনার কী করা উচিত?

  1. 1জমি বা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্পর্ক দানকরমুক্ত তালিকার (পিতা, মাতা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, আপন ভাই-বোন) অন্তর্ভুক্ত কি না তা যাচাই করুন।
  2. 2করযোগ্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিলে উল্লিখিত মূল্যের পরিবর্তে দানের তারিখের খোলাবাজার মূল্যের ভিত্তিতে করের ধাপ হিসাব করুন।
  3. 3কোনো অর্থবছরে করযোগ্য দান সম্পন্ন হলে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে নির্ধারিত ফরমে দানের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করুন।

সূত্র: Prothom Alo