১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সীমিতকরণের একাধিক বিধান রয়েছে, যা একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সংবিধান দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের ‘বাংলাদেশের সংবিধান: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও ভবিষ্যৎ’ বইয়ের বিশ্লেষণে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, সংবিধানে মৌলিক অধিকারের তালিকা থাকলেও ৩৬ থেকে ৩৯ অনুচ্ছেদের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলোকে বিভিন্ন শর্তের অধীন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ১৯৭৩ সালে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ১৪১(ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে রাষ্ট্রপতিকে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার আওতায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার স্থগিত করার সুযোগ তৈরি হয়। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনে জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান যুক্ত হলেও তা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখেনি।
সংবিধানে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের দিকটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে ব্যাপক সাংবিধানিক কর্তৃত্ব থাকায় এবং ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির জন্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হয়নি। এর সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৭০-এর কারণে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন না, যা আইনসভায় সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা খর্ব করে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে আরও বেশি নিরঙ্কুশ করেছে।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগেও মূলত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, সংবিধানে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত কাঠামোতে এমন কিছু সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার পথে বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহির অভাব ও ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের উৎস হিসেবে বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান ও সংশোধনীর আইনি দুর্বলতাগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, এই পর্যালোচনায় তা সুনির্দিষ্ট অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সূত্র: Prothom Alo


















