বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে নিজস্ব মুদ্রা রেনমিনবি বা ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে চীন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেওয়া এক ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দেশকে একটি শীর্ষস্থানীয় আর্থিক শক্তিতে রূপান্তরের নির্দেশ দেন এবং একটি শক্তিশালী মুদ্রাকে সেই রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
চীনের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য ডলারকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একধরনের অর্থনৈতিক সুরক্ষা তৈরি করা। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের পর ওয়াশিংটন যেভাবে ডলার ব্যবস্থাকে শাস্তিমূলক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তেমন কোনো পদক্ষেপ বেইজিংয়ের ওপর এলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। সেজন্য ডলার ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে সম্মানজনক দ্বিতীয় অবস্থানে থাকাকেই যথেষ্ট মনে করছে বেইজিং।
মুদ্রা হিসেবে রেনমিনবির বিস্তারে চীন ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। প্রথম ধাপে পেমেন্ট বা লেনদেন নিষ্পত্তির অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ২০০৯ সালে সীমান্ত পেরোনো লেনদেনের পাইলট প্রকল্প এবং ২০১৫ সালে গড়ে তোলা ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের (CIPS) মাধ্যমে লেনদেনের নেটওয়ার্ক তৈরি করে চীন। চীনা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য বাণিজ্য এখন রেনমিনবিতে নিষ্পত্তি হয়।
বর্তমানে চীন মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন ও ঝুঁকি হস্তান্তরের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। চীন যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানি করে, সেগুলোর জন্য স্থানীয় বাজারে নিজস্ব মুদ্রায় মূল্যের বেঞ্চমার্ক বা ‘চায়না প্রাইসেস’ চালুর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ব্যাটারি তৈরির উপাদান যেমন লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো সংকটপূর্ণ খনিজগুলোর ক্ষেত্রে বেইজিং এই ভূমিকা জোরদার করতে চাইছে। পাশাপাশি ২০২৩ সাল থেকে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র–সমর্থিত ব্যাংকগুলো বিদেশে রেনমিনবিভিত্তিক ঋণ ও বাণিজ্য অর্থায়ন বাড়াতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোডলার ব্যবস্থার বিপরীতে চীন ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলকে রেনমিনবি ব্যবস্থার প্রধান নোঙর হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাটারি উৎপাদনকারী হিসেবে চীন তাদের সবুজ শিল্প নেতৃত্বকে আর্থিক শক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সবুজ বাণিজ্যের লেনদেন ও অর্থায়নে রেনমিনবির প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
চীনের এই পদক্ষেপ সফল হলে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ও অর্থায়নে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কিছুটা সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশ ও বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে বিকল্প আর্থিক চ্যানেলে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে।
সূত্র: Prothom Alo


















