২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছে। তবে শুধুমাত্র রেমিট্যান্সের মোট অঙ্ক দিয়ে অভিবাসন খাতের সাফল্য বিচার না করে কর্মীদের কাজের মান, নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত মজুরির বিষয়টি নিশ্চিত করার তাগিদ এসেছে এক বিশ্লেষণে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শাহীদ খন্দকার ও সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ ফারহাদ আহমেদের মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের কৌশল নতুন করে সাজানো জরুরি।

বর্তমানে বহু বাংলাদেশি অভিবাসী কম মজুরির কাজে যাচ্ছেন, যার পেছনে ব্যক্তিগত ব্যয়ও অনেক বেশি। ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৪৭ শতাংশই ছিলেন স্বল্পদক্ষ বা কম দক্ষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এর পাশাপাশি গন্তব্য দেশের ক্ষেত্রেও একক নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশ ছাড়াদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মীই গেছেন সৌদি আরবে। ফলে কোনো একটি বড় বাজারে নীতিগত বা অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলে তা বিপুলসংখ্যক পরিবারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলার ঝুঁকি রাখে।

এদিকে বিশ্বজুড়ে বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা ও শ্রমিক সংকটের কারণে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ইউরোপিয়ান লেবার অথরিটির তথ্য অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, হসপিটালিটি, টেকনিক্যাল ট্রেড ও পরিবহনে কর্মী সংকট রয়েছে। জার্মানিতে নার্স ও টেকনিক্যাল কর্মী এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিদেশি কর্মী নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বাজারে প্রবেশের জন্য ভাষা দক্ষতা, পেশাগত লাইসেন্স ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের প্রয়োজন হয়।

প্রযুক্তির অগ্রগতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের প্রতি চারজন শ্রমিকের একজন কোনো না কোনোভাবে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সংস্পর্শে থাকা পেশায় কাজ করছেন। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে শারীরিক শ্রমের সাধারণ কাজের চাহিদাও কমছে। এই পরিস্থিতিতে নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, কারখানার যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে চাহিদামতো কর্মী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতিতে পাঁচটি মূল অগ্রাধিকারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রথমত, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়মিত ত্রৈমাসিক তথ্য প্রকাশ করে প্রকৃত চাহিদা ও ভিসার শর্ত যাচাই করা। দ্বিতীয়ত, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবমুখী কারিগরি, ভাষা ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া যারা কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন (রিকগনিশন অব প্রায়র লার্নিং) করে সনদ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। চতুর্থত, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও লিখিত চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় কমানো। পঞ্চমত, সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোর প্রকৃত ফলাফল—যেমন যাচাইকৃত চাকরি ও কর্মপরিবেশ—পর্যবেক্ষণ করে নীতি নির্ধারণ করা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহায়তায় ‘ইইউ-বাংলাদেশ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’-এর আওতায় ৩,০০০ কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসনের উদ্যোগকে এ ধরনের কাঠামোর একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

একক গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে কম দক্ষ কাজের সুযোগ কমে আসা বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও সনদ ছাড়া ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

সূত্র: The Business Standard