আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের কার্যাদেশ প্রতিনিয়ত বাড়ছে বাংলাদেশে। সাধারণ পোশাক তৈরির দীর্ঘদিনের ধারা থেকে বেরিয়ে দেশের উদ্যোক্তারা এখন ব্লেজার, স্যুট, জ্যাকেট, বিয়ের পোশাক (ওয়েডিং গাউন) এবং টেকনিক্যাল অ্যাপারেল তৈরিতে কারখানাগুলোর সক্ষমতা বাড়াচ্ছেন। বৈশ্বিক বাজারে এসব বিশেষায়িত পোশাকের কিছু পণ্য ৪০০ থেকে ১,০০০ ডলার বা তার বেশি খুচরামূল্যে বিক্রি হচ্ছে।

পোশাক শিল্প মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, জার্মানির হারকো, ডেনমার্কের বেস্টসেলার গ্রুপের বালমোহক ছাড়াও এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট এবং ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে প্রিমিয়াম পোশাক তৈরি করাচ্ছে। বিজিএমইএ-র পরিচালক শেখ মুস্তাফিজ জানান, উচ্চমূল্যের পোশাক বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সুপরিচিত অন্তত ২০টি নতুন ব্র্যান্ড গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কার্যাদেশ দেওয়া শুরু করেছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাকের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এই উচ্চমূল্যের পোশাকের দখলে, যা এক দশক আগেও ছিল মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি। কারো কারো মতে এই হিস্যা প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থবছর ২০২৫-২৬ এ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির মোট আয় প্রায় ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানিমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩.৮৭ বিলিয়ন থেকে ৫.৮১ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা 'বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস'-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আউটারওয়্যার, ড্রেসেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো ক্যাটাগরিগুলো দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯.৩৫ শতাংশ ছিল।

বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে। যেমন, আদমজী ইপিজেডের ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য ওয়েডিং গাউন তৈরি করছে, যার আন্তর্জাতিক খুচরামূল্য ৪০০ থেকে ১,০০০ ডলার। আবার এনার্জিপ্যাক ফ্যাশনস লিমিটেডের তৈরি স্যুট ও ব্লেজারের কিছু পণ্যের খুচরামূল্য ৯০০ ইউরো পর্যন্ত। টিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্যাকেট ও আউটারওয়্যার রপ্তানি করছে, যার বড় অংশই প্রিমিয়াম মানের। এছাড়া অনন্ত গ্রুপ, স্নোটেক্স, ডিবিএল, স্কয়ার ও এপিলিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ধরনের উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় মৌলিক বা সাধারণ পোশাকে এখন মুনাফার হার কমে ২–৩ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে উচ্চমূল্যের পোশাকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফা করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডগুলো একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে 'চায়না প্লাস ওয়ান' কৌশল নেওয়ায় এবং অন্যান্য দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে উচ্চমূল্যের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক বাজারে সস্তা পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে দীর্ঘদিনের পরিচিতি এখনো এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

মৌলিক পোশাকে মুনাফার হার কমে আসায় টিকে থাকার স্বার্থেই বাংলাদেশের কারখানাগুলো উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে 'চায়না প্লাস ওয়ান' কৌশলের কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বৈচিত্র্যময় সরবরাহ ব্যবস্থার খোঁজে বাংলাদেশে আসছে, যা দেশের রপ্তানি আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

সূত্র: The Business Standard