পাঁচ বছরের এমবিবিএস এবং এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর তীব্র ক্যারিয়ার সংকটের মুখে পড়ছেন বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসকেরা। প্রতি বছর বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী পাস করে বের হলেও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় অনেকেই পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কর্মস্থলে রোগীর স্বজনদের হামলা, মফস্বলে থাকার অনুপযুক্ত পরিবেশ এবং উচ্চশিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা এর অন্যতম কারণ।

বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুযোগ পাওয়া চিকিৎসকদের প্রথম দুই বছর বাধ্যতামূলকভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করতে হয়। নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত মেডিকেল অফিসার ডা. ফারিহা জানান, ফ্লু, ডেঙ্গু বা হামের মৌসুমে সকালের এক শিফটেই প্রায় ১২০ জন রোগী দেখতে হয়। সেখানে রোগীদের শৃঙ্খলায় রাখার জন্য কোনো সহকারী থাকে না। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকায় জটিল রোগীদের জেলা হাসপাতালে রেফার করা হলেও স্বজনরা অনেক সময় জোর করে ভর্তি করান এবং রোগীর অবনতি হলে চিকিৎসকের ওপর চড়াও হন।

উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের আবাসন ব্যবস্থাও নাজুক। চিকিৎসকদের অভিযোগ, প্রশাসনের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তুলনায় চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্দ কোয়ার্টারগুলো দীর্ঘকাল ধরে সংস্কারহীন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে। অনেক জায়গায় পানি ও বিদ্যুতের নিয়মিত ঘাটতি থাকে, যা নারী চিকিৎসকদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের (স্যাকমো) প্রভাব এবং রাজনৈতিক বাধার কারণে এমবিবিএস চিকিৎসকদের পক্ষে বেসরকারিভাবে চেম্বার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

উচ্চশিক্ষার পথটিও তরুণ চিকিৎসকদের জন্য বেশ কঠিন। দেশে এফসিপিএস (FCPS) প্রশিক্ষণ কাগজে-কলমে পাঁচ বছরের হলেও বাস্তবে তা শেষ করতে সাত থেকে বারো বছর পর্যন্ত লেগে যায়। সরকারি ক্যাডারের বাইরে থাকা প্রশিক্ষণার্থীদের মাসিক ভাতা ৩৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হলেও তা দেওয়া হয় প্রতি ছয় মাস পর পর। দীর্ঘ সময় কোনো আয় না থাকায় পারিবারিক ভরণপোষণ চালাতে গিয়ে বেশিরভাগ চিকিৎসককে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। অন্যদিকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগও আগের চেয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং পরীক্ষার ফি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনাও নিয়মিত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ১৬ মে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জরুরি বিভাগে ঢুকে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. নাসির ইসলামের ওপর হামলা চালানো হয়। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে আগস্ট মাসে ঢাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমানও হামলার শিকার হন। সিলেট, পঞ্চগড়, ঢাকা ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় বিশ্ব মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনও (WMA) উদ্বেগ জানিয়েছে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

পাবলিক হেলথ সিস্টেমে পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল না থাকায় একদিকে রোগীরা প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে উদীয়মান চিকিৎসকদের অনেকেই ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস বা দেশ ছাড়ার পথ খুঁজছেন।

সূত্র: The Business Standard