প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের আট মাস পূর্ণ হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সামলাতে গিয়ে সরকারকে শুরুতেই অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ কিছুটা স্বস্তি দিলেও মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো নানা বিষয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট মেয়াদে দেশে ১৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। তবে স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে নামলেও সাধারণ পরিবারের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান রয়ে গেছে। আগস্টে মজুরি সূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বরাতে জানা গেছে, অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই-আগস্ট) রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা কম। রাজস্ব আহরণে ভাটা থাকা সত্ত্বেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, মেগা প্রকল্প এবং বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার মতো সরকারের বিভিন্ন বড় ব্যয় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হিসাবে হত্যা মামলা ২ হাজার ৩১৭টি থেকে কমে ২ হাজার ১২২টিতে এবং ডাকাতি মামলা ১ হাজার ১৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৭টিতে নেমেছে। তবে চুরির মামলা ১৩ শতাংশ বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’-এর হিসেবে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১৩১ জন নিহত হয়েছেন। কুষ্টিয়ায় এক পীরকে পিটিয়ে হত্যা, ঢাকার মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর এবং বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য দাবি করেছেন, বেশিরভাগ মামলার আসামিদের নির্দিষ্ট সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নাজুক পরিস্থিতি থেকে পুলিশ বাহিনীকে সংগঠিত করার কাজ করছে।

পররাষ্ট্রক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন ও মালয়েশিয়া সফর এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিলেও এখনও ভারত সফর করেননি। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাকে ফেরত আনার দাবি এবং দ্বিপক্ষীয় প্রোটোকল জটিলতায় দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব দেখা গেছে। বিপরীতে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি এসেছে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

এই মূল্যায়নটি দেখায় যে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জগুলো এখনো পুরো কাটেনি। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার যোগান স্বস্তি দিলেও বাজেট ঘাটতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের সতর্কতা সামনের দিনগুলোতে সরকারি নীতি ও ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: Dhaka Post