ঢাকা ওয়াসার প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পদ্মা নদীর পানি মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়ায় শোধন করে ঢাকায় সরবরাহের লক্ষ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। তবে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, প্রয়োজনীয় বিতরণ লাইন নির্মাণ না করা এবং নির্ধারিত পরিমাণ পানি সরবরাহে ব্যর্থতার কারণে প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য ও হিসাব অনুযায়ী, অনিয়ম ও পানির সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, পাইপ কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সরবরাহকৃত পানির ঘাটতির কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ওয়াসার গড় উৎপাদনের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটিতে দৈনিক প্রায় ২০ কোটি লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে, যা নির্ধারিত সরবরাহের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ২০১৯ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৭০৩ দিনে প্রকল্পটিতে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৬০ কোটি লিটার পানি। নির্ধারিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক মূল্য অনুযায়ী এই অবিক্রীত পানির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। পাইপ কেনায় আত্মসাতের অভিযোগের অর্থের সঙ্গে অবিক্রীত পানির সম্ভাব্য এই বিক্রয়মূল্য যোগ করে মোট সম্ভাব্য ক্ষতির অঙ্ক ধরা হয়েছে। তবে এটি আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষিত নিট ক্ষতি নয়।

প্রকল্পটিতে কারিগরি আপত্তি উপেক্ষা করে কম পুরুত্বের ‘কে-৯’ ডাকটাইল পাইপ ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আপত্তি জানালে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বুয়েটের মাধ্যমে পাইপের মান যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতাও উপেক্ষা করা হয়। পূর্ণ সক্ষমতা যাচাই করতে একসঙ্গে পাঁচটি পাম্প চালানোর সময় সঞ্চালন লাইনের পাইপ ফেটে সড়ক ও পার্শ্ববর্তী ভবনের ক্ষতি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। এরপর আর পুরো সক্ষমতায় পাম্প চালানো হয়নি। পাশাপাশি ডেনিশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মানবিষয়ক আপত্তিও বাস্তবায়ন পর্যায়ে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অনিয়মে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান, প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আজিজুল আকিল ডেভিডের নাম জড়িয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। যোগাযোগ করা হলে আজিজুল আকিল ডেভিড জানান, সরকার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে এবং তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। তাকসিম এ খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বিগত সরকারের সময়ের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কাজ করেছে এবং প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। দুদক বিস্তারিত তদন্ত শেষ করলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

বড় ব্যয়ের এই অবকাঠামো প্রকল্পটির ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন ঢাকাবাসীর সুপেয় পানির সংকট কাটেনি, অন্যদিকে প্রকল্পের সেবা নিশ্চিত না হলেও সরকারকে এর বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে।

সূত্র: banglanews24.com