দীর্ঘ গবেষণার পর বিলুপ্তপ্রায় ফুটি কার্পাস তুলা পুনরুদ্ধার করে কিংবদন্তির ঢাকাই মসলিন বাণিজ্যিকভাবে বিশ্ববাজারে নিয়ে আসার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ১৮৫০ সালে লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতে শেষবার আদি মসলিন প্রদর্শনের পর প্রায় ১৭০ বছর এটি মূলত ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। সরকারের উদ্যোগ, গবেষকদের জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং স্থানীয় নারী কারিগরদের শ্রমে এই ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প এখন গবেষণাগার ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রবেশ করছে।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে গবেষক দল গঠিত হয়। ১৭৮৮ সালের সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের বইয়ের স্কেচ ও ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গাজীপুর, কাপাসিয়া, বাঘাবাড়ী ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে ৩৯টি তুলার জাত সংগ্রহ করা হয়। পরে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার নমুনার সাথে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং মিলিয়ে খাঁটি ফুটি কার্পাস শনাক্ত করা হয়। সুতা তৈরির কাজে আদি ৫০টিরও বেশি বিশেষ যন্ত্রপাতি নতুন করে প্রস্তুত করতে হয়েছে। বর্তমানে পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিনের সুতার মান ৭৩১ থেকে ৭৫০ মেট্রিক কাউন্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ লাভ করে।
প্রথম ধাপের গবেষণার পর বর্তমানে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত 'ঢাকাই মসলিন হাউস'-কে কেন্দ্র করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে এ প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া কাঁচামাল নিশ্চিত করতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার চাষিদের সাথে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত তিন শতাধিক গ্রামীণ নারীকে সুতা কাটার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইতোমধ্যে ৫০০ গজ কাপড়ের একটি বড় অর্ডার সম্পন্ন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো এই কাপড় সংগ্রহে আগ্রহ দেখিয়েছে। একটি মসলিন শাড়ি তৈরিতে ২ থেকে ৪ জন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগে। শুরুতে প্রতি শাড়ির উৎপাদন খরচ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হলেও ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে তা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক লাক্সারি ফ্যাশন পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের ক্ষেত্রে এটি বড় ক্ষেত্র তৈরি করছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
তৈরি পোশাকের প্রচলিত কম দামের বাজারের বাইরে আন্তর্জাতিক উচ্চমূল্যের লাক্সারি পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের পথ তৈরি করছে ঢাকাই মসলিন। জিআই সনদপ্রাপ্ত এ শিল্পের বাণিজ্যিক পুনরুজ্জীবন একই সঙ্গে গ্রামীণ নারী কর্মসংস্থান ও বিশেষায়িত তুলার কৃষিতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যুক্ত করছে।
সূত্র: The Business Standard


















