১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের প্রায় সাত দশক পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আমিন আহমাদির এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খালের মতো একটি ঐতিহাসিক মোড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করার পর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল সেখানে সামরিক অভিযান চালায়। ওই সামরিক পদক্ষেপ ব্রিটেনের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করে এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের দরপতন ঠেকাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে ডলারের রিজার্ভ ব্যবহার করতে হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের বিরোধিতা ও আর্থিক সহায়তার অভাবে শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনকে সেখান থেকে পিছু হটতে হয়, যা বিশ্বমঞ্চে দেশটির একক প্রভাবের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ্যে এনেছিল।
বর্তমান বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচ এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে রয়টার্সের প্রতিবেদনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য আসে, যা যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি করে। জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে সাধারণ পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ব্যয় বাড়ছে। এছাড়া সামরিক অভিযানের খরচ এবং বিদ্যমান সরকারি ঋণের সুদের বোঝাও যোগ হচ্ছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সম্পদ ব্যাহত হতে পারে, যা এশিয়াসহ অন্যান্য অঞ্চলে চীনের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত না হলে ব্যয়বহুল সংঘাত চালিয়ে যাওয়া কিংবা ক্ষতি সীমিত করে পিছু হটার বিষয়ে ওয়াশিংটনকে কঠিন হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হতে পারে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। এর ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ ও সুদের হারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সূত্র: Prothom Alo


















