ভারতে নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ার আওতায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ৩০ লাখ নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা সামনে আসার পর দেশজুড়ে বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন বিজেপির উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) দাবি করেছে, মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে সরিয়ে ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচক এবং অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বহু বৈধ ভোটারকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এতে মূলত মুসলিম ও দলিতরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ভারতের দ্য ওয়্যার-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়া ২৭ লাখ ৫০ হাজার নামের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখই মুসলিম, যা প্রকাশিত অযোগ্য তালিকার প্রায় ৭০ শতাংশ। অথচ রাজ্যে মুসলিম ভোটারদের হার মোট ভোটারের মাত্র ২৫ শতাংশ। কিছু কিছু জেলায় বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে মুসলিমদের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লি এবং ওড়িশাসহ বিভিন্ন রাজ্যে বহু বৈধ নাগরিক হঠাৎ খসড়া তালিকায় নিজেদের নাম না দেখে বিপাকে পড়েছেন। ওড়িশার কটকে স্থানীয় ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারের হস্তক্ষেপে কিছু বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল হলেও নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে এভাবে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি দিল্লিতে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ অংশ নেন। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি আন্দোলন ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ স্লোগানে কেন্দ্রীয় দিল্লির কনট প্লেস ও দিল্লি হাটের দিকে মিছিলের ডাক দেয়। বিক্ষোভকারীরা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেস কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল করায় পুলিশ বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও ছাত্রনেতাকে আটক করে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী তাঁদের মতামত ও অনুমোদন ছাড়া সিদ্ধান্ত জারি করা নিয়ে ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়া, ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন এবং ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশের মতো বিষয়ে তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে নির্বাচন কমিশন অভ্যন্তরীণ মতভেদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে এবং কমিশনের নোটগুলো ছিল মূলত পরামর্শ মাত্র।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের ২০২৯ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ও আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলোর আগে বিশাল সংখ্যার ভোটারের নাম বাদ পড়া দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ ভারতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সূত্র: Middle East Eye