পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন আটটি বড় প্রকল্পে কাজ না করে কিংবা সামান্য কাজের বিপরীতে প্রায় ১,১৯৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত তুলে আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নেওয়া ১৭টি প্রকল্প তদন্ত করে এলজিইডির জেলা কার্যালয় এই অনিয়ম চিহ্নিত করে। অভিযুক্ত আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, তার তিন ভাই ও এক ভাইয়ের স্ত্রীর মালিকানাধীন।

তদন্ত প্রতিবেদন ও নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোতে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল ছাড়, একই কাজের বিপরীতে একাধিকবার অর্থ গ্রহণ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নথিপত্র গায়েব করার মতো ঘটনা ঘটেছে। ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই আটটি প্রকল্পের মোট চুক্তিভিত্তিক মূল্য ছিল ২,১৪১ কোটি টাকা। কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী যেখানে ৮২৬ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা ছাড় হওয়ার কথা, সেখানে মোট ২,০৬৯ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। অর্থাৎ কাজের চেয়ে প্রায় ১,২৪৩ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।

একটি প্রকল্পে অনুমোদিত ৯৩৬ কোটি টাকার বিপরীতে ঠিকাদার ৯৯৬ কোটি টাকা তুলে নেন, যা চুক্তিমূল্যের চেয়েও ৬০ কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ মাত্র ১৫ শতাংশ হলেও বরাদ্দের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ৬২৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় ১০ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়কের চুক্তি স্বাক্ষরের তিন বছর পার হলেও কাজ শুরুই হয়নি, অথচ ১৫ দশমিক ৯২ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যের মধ্যে ঠিকাদার তুলে নিয়েছে ১৩ দশমিক ২৩ কোটি টাকা।

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান—ইএফটিই. ইটিসিএল (প্রা.) লিমিটেড, ইএফটিই এন্টারপ্রাইজ, ইএফটিই ট্রেডিং করপোরেশন এবং সাউথ বাংলা ট্রেডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন মহারাজের ভাই মেরাজুল ইসলাম। পঞ্চম প্রতিষ্ঠান শিমু এন্টারপ্রাইজ মেরাজুলের স্ত্রী শামীমা আক্তারের এবং ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হরিণপালা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মহিউদ্দিন মহারাজ নিজে। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠান তাঁর অন্য দুই ভাই মো. শামসুদ্দিনের মেসার্স তেলি খালী কনস্ট্রাকশন এবং মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের ঈশান এন্টারপ্রাইজ। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানই পিরোজপুর এলজিইডি থেকে একক দরদাতা হিসেবে প্রায় ২০০টিসহ মোট পৌনে চার শতাধিক কার্যাদেশ পায়।

২০২৫ সালে এলজিইডির একটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া এমন বড় আকারের দুর্নীতি সম্ভব ছিল না। এ ছাড়া সিএজি কার্যালয়ের নিরীক্ষায় ওই ১৭ প্রকল্পে ২,৬৬৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ঘটনায় মহিউদ্দিন মহারাজ, তাঁর ভাই ও এলজিইডি-হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের ২২ কর্মকর্তাসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে আটটি মামলা করেছে। পিরোজপুর ও ঢাকায় তাদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

বর্তমানে পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, অনিয়মে জড়িত আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রকল্পগুলো বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে এসব অবকাঠামোর কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মেরাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, কাজ ছাড়া কোনো টাকা তোলা হয়নি এবং অর্থবছরের অর্থ যাতে ফেরত না যায় সেজন্য কিছু ক্ষেত্রে আগাম অর্থ নেওয়া হয়েছিল। মহিউদ্দিন মহারাজও দাবি করেন, তিনি মাত্র সাত মাস এমপি ছিলেন এবং কোনো অনিয়মে জড়িত ছিলেন না।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

এই অনিয়মের কারণে বরিশাল ও পিরোজপুর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য গৃহীত বহু কোটি টাকার সড়ক ও সেতু প্রকল্প মাঝপথে থমকে গেছে। আইনি প্রক্রিয়া ও ঠিকাদার বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙাচোরা রাস্তা ও অসম্পূর্ণ কাঠামোর দুর্ভোগ পোহাতে হবে, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় তহবিলের বড় অঙ্কের অর্থ ঝুঁকিতে পড়েছে।

সূত্র: The Daily Star