বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি এনে দেওয়া জনসংখ্যাগত সুবিধা বা জনমিতিক সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেশটির হাতে আর প্রায় ১৯ বছর সময় রয়েছে। এর পর থেকেই কমতে শুরু করবে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত এবং দ্রুত বাড়বে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা।

‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২৭ সালে ‘বার্ধক্যশীল’ জনসংখ্যার পর্যায়ে প্রবেশ করবে, যখন মোট জনসংখ্যার অন্তত ৭ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। পরবর্তীতে ২০৫১ সালে এই অনুপাত ১৪ শতাংশ অতিক্রম করে দেশ পূর্ণাঙ্গ ‘বয়স্ক’ জনসংখ্যার পর্যায়ে পৌঁছাবে। পশ্চিমা দেশগুলো এই পরিবর্তনের জন্য কয়েক দশক বা শতকের বেশি সময় পেলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রূপান্তরটি ঘটছে অনেক দ্রুত এবং তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয়ের মধ্যে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগানোর প্রধান পূর্বশর্ত হলো উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করা। দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম মানুষের মাত্র ৬০ শতাংশ কোনো না কোনো কাজে যুক্ত এবং এর মধ্যে ৮৮ শতাংশই কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সংকট, আমদানি শুল্কায়নে বিলম্ব, প্রশিক্ষণের অভাব এবং উদ্ভাবনে কম বিনিয়োগের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত গতিতে কর্মসংস্থান বাড়াতে পারছে না।

অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর জন্য নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপরও জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বর্তমানে মাত্র ৩৫ শতাংশ। মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি নারীদের শ্রমে অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বর্তমান ধারার চেয়ে ৪ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। তবে পারিবারিক দায়িত্ব, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার অসংগতি নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত রাখছে।

একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও আর্থিক সুরক্ষার ঘাটতি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বয়স্কদের মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান এবং জিডিপির অনুপাতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় এই অঞ্চলে কমেছে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু হলেও তা এখনো মূলত স্বেচ্ছামূলক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ কর্মীর জন্য অবসরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। সময় থাকতেই মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর না দিলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধা ভবিষ্যতে বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার দেশে রূপান্তরের আগে বাংলাদেশ যদি কর্মক্ষম তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও কার্যকর পেনশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হওয়ার এবং সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বড় ঝুঁকি তৈরি হবে।

সূত্র: Prothom Alo